মেহেদী হাসান জুয়েল, গলাচিপা, পটুয়াখালী:
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় এক সরকারি সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে ঘুষ নিয়ে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
পৈতৃক ভিটায় ঘর তুলতে গিয়ে এক অসহায় পরিবার চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মো. আনছার উদ্দিনের দেওয়া মিথ্যা প্রতিবেদনের কারণে পৈতৃক ও ক্রয়কৃত নিজ জমিতে নতুন করে ঘর তুলতে পারছেন না শাহিনুর বেগম নামের এক নারী।
তদন্তে ঘটনার সত্যতা মিললেও সার্ভেয়ার মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে উল্টো প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছোট বাইশদিয়া ইউনিয়নের নয়া ভাংগুনি গ্রামের বাসিন্দা মৃত সোনা খানের কন্যা শাহিনুর বেগম। পিতা সোনা খান জীবিত থাকাকালীন শাহিনুরকে নাসির শিকদারের সাথে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই হিসেবে নিজের বাড়িতেই রেখেছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর শাহিনুর ও তার স্বামী দীর্ঘদিন ওই বাড়িতেই বসবাস করেন। পরবর্তীতে সংসারের অভাব-অনটনের কারণে তারা জীবিকার তাগিদে সাময়িকভাবে ঢাকায় পাড়ি জমান। দীর্ঘ সময় বাড়িতে কেউ না থাকায় তাদের বসতঘরটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।
গত তিন মাস আগে শাহিনুর বেগম ও তার স্বামী নাসির শিকদার স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। এরপরই শুরু হয় বিপত্তি। তারা যখন তাদের জরাজীর্ণ ঘরটি নতুন করে সংস্কার করতে যান, তখন বাড়ির অপর পাশে বসবাসরত বেল্লাল হোসেনের স্ত্রী সালেহা বেগম কাজে বাধা দেয়।
ঘর তোলায় বাধা দিয়েই ক্ষান্ত হননি সালেহা বেগম। তিনি নিজে বাদী হয়ে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শাহিনুর বেগম ও তার স্বামীসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারার একটি মামলা দায়ের করেন।
আদালত শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতি অবস্থা বজায় রাখতে রাঙ্গাবালী থানাকে নির্দেশ দেন এবং জমির প্রকৃত মালিকানা ও দখল বিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ারকে নির্দেশ প্রদান করেন।
আদালতের নির্দেশ পেয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মো. আনছার উদ্দিন ঘটনাস্থল তদন্ত করেন। কিন্তু তিনি আদালতে যে প্রতিবেদন দাখিল করেন, তাতে উল্লেখ করা হয়— বিরোধীয় জমির ওপর বাদী সালেহা বেগম বহু পূর্ব থেকে পুকুর ও বাগান করে ভোগদখলে আছেন।
উভয় পক্ষের মধ্যে জমি নিয়ে যে কোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিলে গত মঙ্গলবার (২ জুন) বেলা ১১টার দিকে সাংবাদিকদের একটি অনুসন্ধানী দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে গিয়ে সার্ভেয়ারের প্রতিবেদনের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল খুজে পাননি তারা।
বিরোধীয় জমিতে এখনো বিবাদী শাহিনুর বেগমের একটি পুরনো ছাপড়া ঘর দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির চারপাশ জুড়ে রয়েছে বহু পুরনো গাছপালা।
উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা সাফ জানিয়েছেন, এই ভিটেমাটি শাহিনুর বেগমের। বাড়ির পুরনো গাছপালাগুলো শাহিনুরের বাবা সোনা খানের লাগানো। শাহিনুর ও তার স্বামী দীর্ঘদিন এখানেই থাকতেন, শুধু অভাবের কারণে কিছুদিন ঢাকায় ছিলেন।
স্বয়ং বাদী সালেহা বেগমও সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন, "ভিটেটি শাহিনুরের বাবার এবং শাহিনুররা এখানে বসবাস করতেন।" তবে বিএস রেকর্ডে ভুল হওয়ার কারণে সালেহা বেগম দেওয়ানী আদালতেও একটি মামলা করেছেন যা চলমান রয়েছে।
ভুক্তভোগী শাহিনুর বেগম ও তার স্বামী নাসির শিকদার ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "এই জমি আমার বাবার ওয়ারিশী সম্পত্তি এবং কিছু অংশ ভাইয়ের কাছ থেকে ক্রয় করেছি।সার্ভেয়ার আনছার উদ্দিন তদন্তে এসে আমাদের দখল পাওয়ার পরেও বলেন— 'তোমাদের পক্ষে রিপোর্ট দিতে হলে ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে। টাকা না দিলে রিপোর্ট উল্টো হবে এবং তোমাদের বড় ক্ষতি হবে।' আমরা নিরুপায় হয়ে ধারদেনা করে সার্ভেয়ারকে ২০ হাজার টাকা দেই। কিন্তু কোর্ট থেকে রিপোর্ট তুলে দেখি তিনি আমাদের বিপক্ষে রিপোর্ট দিয়েছেন!"
তারা আরও জানান, টাকা ফেরত ও রিপোর্টের বিষয়ে জানতে রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসে গেলে সার্ভেয়ার তাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত সার্ভেয়ার মো. আনছার উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ সংক্রান্ত কোনো কথা বলতে রাজি নন বলে লাইন কেটে দেন।
পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাঙ্গাবালী ভূমি অফিসে গিয়ে সরাসরি তার রিপোর্টের অসঙ্গতি ও ঘুষের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং তড়িঘড়ি করে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
একটি জরাজীর্ণ ঘর সংস্কার করতে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তার অনৈতিক বাণিজ্যের শিকার হয়ে অন্যের বাড়িতে দিন কাটছে শাহিনুরের পরিবারের। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারটি এই ‘মিথ্যা’ প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তপূর্বক দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ারের শাস্তি এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন।