তাড়াইলে নরসুন্দা নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে বরুহা গ্রামের সওদাগরপাড়া মানুষের বসতভিটা



রুহুল আমিন, তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে নরসুন্দা নদীর পাড় ঘেষে উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়নের বরুহা গ্রামের ৫নং ওয়ার্ড অর্থাৎ সওদাগরপাড়া হতে রাজঘাট পর্যন্ত প্রায় ২০০টি পরিবারের বসবাস। যুগের পর যুগ নরসুন্দা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একটি ওয়ার্ডের অধিকাংশ বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ নানা স্থাপনা। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদী পারের মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যত্র আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার নদী পারে ছাপড়া উঠিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের পাশে এখনো দাঁড়াননি সরকারি অথবা বেসরকারি কোনো কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধি। ফলে পরিবারগুলো খেয়ে না-খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। 
 
এক সপ্তাহ আগে নিজেদের বাড়ি হারিয়েও নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুরমিন আক্তার, মমতা বেগম, লিলু আক্তার। নরসুন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা হাত দিয়ে দেখালেন, ওই যে দুরে যেখানে জল পাক খাচ্ছে, সেখানেই ছিল আমাদের ঘর। গাছপালা, গোয়ালঘর ছিল, কিন্তু এখন আর তাদের কিছুই নেই। তারা বলছিলেন, দু'সপ্তাহ ধরেই নদী একটু একটু করে ভাঙ্গতে শুরু করে। হঠাৎ তাদের ভিটেমাটি নদীতে তলিয়ে যায়। কিছুদিন হল তারা অন্যত্র ঘর বেঁধেছেন।

হারুন অর রশিদ, হাবুল মিয়া, জামাল মিয়া, আংগুর মিয়া ও হাবিবুর রহমান বলেন, বরুহা গ্রামের সওদাগরপাড়ার নদীর পাড়ের মানুষগুলো তাদের পৈতৃক আমল থেকেই এখানে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে অনেক প্রতিকুল অবস্থার মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছেন। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিনই মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ছেন। তারা আরও বলেন, নদী ভাঙনের গতি প্রবল থাকায় আমাদের বসতবাড়ি নরসুন্দার গর্ভে তলিয়ে গেছে। নদী পাড়ের অনেকেই বাড়িঘর হারিয়ে অসহায় মানুষজন অন্যত্র বসবাস করছেন।

স্বপন মিয়া, নিজামুদ্দিন, রমজান মিয়া, আঙ্গুর মিয়া, কাদির মিয়া, নয়ন মিয়া ও ইছাক মিয়া সহ আরও অনেকেই বলেন, কৃষিজমি যা ছিল, সব নদে গেছে। আমরা সহায়সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমরা রিলিফ চাই না, সরকার যদি নদী ভাঙনরোধ করে দেয়, তাহলে কোনোমতে বাঁচতে পারব। তারা আরও বলেন, আমাদের ঘরবাড়ি ও গাছপালা সব নদে ভেঙে গেছে। নিজের জায়গা না থাকায় নদের পাশেই ছাপড়া তোলে কোনো রকম ঠাঁই করে আছি। সরকারের কাছে দাবি, নদে যেন বানদি দেয়।

উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজিজুল ইসলাম বলেন, বরুহা গ্রামের ৫ নং ওয়ার্ডে ১ হাজার ৮৯০ জন ভোটার ছিল। নদী ভাঙনের ফলে অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

দিগদাইড় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আশরাফ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় নদের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বসতবাড়ী নদের গর্ভে বিলীন হচ্ছে। ফলে নতুন করে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। এখনই নদের ভাঙন রোধ করা না হলে সম্পূর্ণ বরুহা গ্রামের সওদাগর পাড়াটি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি নদে বিলীন হওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারগুলোর কেউ তাদের আত্মীয়স্বজন ও কেউ নদের পাশেই খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। তাদের পুনর্বাসন করা জরুরি।

তাড়াইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা আখতার বলেন, বরুহা গ্রামের ৫নং ওয়ার্ডের সওদাগরপাড়ার অধিকাংশ পরিবার নরসুন্দা নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়ে তাদের বাড়িঘর হারিয়ে নি:স্ব হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নয়। আপনার মাধ্যমেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলাম। অতিদ্রুত আমি খোঁজখবর নেব।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কিশোরগঞ্জ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন  বলেন, নরসুন্দা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তাড়াইল উপজেলার দিগদাইড় ইউনিয়নের বরুহা গ্রামের ৫নং ওয়ার্ডের সওদাগরপাড়ার অধিকাংশ পরিবারের বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ নানা স্থাপনা। এ বিষয়টি আপনার কাছ থেকেই বিস্তারিত জেনেছি। ভাঙন এলাকাটি পরিদর্শনে আসব। সেখানে কী ব্যবস্থা নিলে নদের ভাঙন রোধ করা যাবে, আমরা সেটাই করব।  
নবীনতর পূর্বতন
দৈনিক আমার পত্রিকা
দৈনিক আমার পত্রিকা